কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬ এ ১১:০৪ AM
কন্টেন্ট: পাতা
গোকুল মেধ (বেহুলার বাসরঘর):

বগুড়া শহর থেকে ১০কিঃমিঃ উত্তরে এবং মহাস্থানগড় থেকে ২কিঃমিঃ দক্ষিণে গোকুল গ্রামের দক্ষিণপশ্চিম প্রান্তে যে স্মৃতিস্থপতি যুগযুগ ধরে অতীতের অসংখ্য ঘটনাবলীর নিদর্শন বুকে জড়িয়ে শির উঁচু করে দাড়িয়ে আছে, ইহাই বেহুলার বাসরঘর নামে পরিচিত। এ বাসরঘর মেড় থেকে মেদ এবং বর্তমানে পুরার্কীতি নামে পরিচিত। তবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মতে আনুমানিক খৃস্টাব্দ সপ্তম শতাব্দি থেকে ১২০০ শতাব্দির মধ্যে এটা নির্মিত। ইস্টক নির্মিত এ স্থপতি পূর্ব পশ্চিমে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ এবং ত্রিকোণ বিশিষ্ট ১৭২টি কক্ষ। অকল্পনীয় এ কক্ষগুলোর অসমতা এবং এলোমেলো বুনিয়াদের বোধগম্যতাকে আরো দুর্বোধ করে তুলেছে । বেহুলার কাহিনী সেন যুগের অনেক পূর্বেকার ঘটনা। বেহুলার বাসরঘর একটি অকল্পনীয় মনুমেন্ট। বর্তমান গবেষকদের মতে এ মনুমেন্ট ৮০৯ থেকে ৮৪৭ খৃস্টাব্দে দেবপাল নির্মিত একটি বৈদ্যমঠ। এই স্থপতিই বাসরঘর নয়। এই স্থপতির পশ্চিমার্ধে আছে বাসর ঘরের প্রবাদ স্মৃতিচিহ্ন। পূর্বার্ধে রয়েছে ২৪ কোণ বিশিষ্ট চৌবাচ্চা সদৃশ একটি বাথরুম। উক্ত বাথরুমের মধ্যে ছিল ৮ ফুট গভীর একটি কুপ। কুপটিতে বেহুলা লক্ষিণদর মধুনিশি যাপনের পর কুপের ক্ষিতজলে স্নান করে তাতে শুদ্ধতা লাভ করতে সক্ষম হতেন।
মহাস্থানগড়, বগুড়া:

মহাস্থানগড়ের বিস্তীর্ণ ধবংসাবশেষ প্রাচীর পুন্ড্রবর্ধনভূক্তির রাজধানী পুন্ড্রনগরের সুদীর্ঘ প্রায় আড়াই হাজার বছরের গৌরবোজ্জল ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। এ ধবংসাবশেষ বগুড়া জেলা শহরের ১৩ কিঃমিঃ উত্তরে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত। সমগ্র বাংলার সর্বপ্রধান ও সর্বপ্রাচীন এ দূর্গনগরী পর্যায়ক্রমে মাটি ও ইটের বেষ্টনী প্রাচীর দ্বারা সুরক্ষিত যা উত্তর দক্ষিণে ১৫২৫ মিঃ দীর্ঘ এবং পূর্ব পশ্চিমে ১৩৭০মিঃ প্রশস্থ ও চতুপার্শ্বস্থ সমতল ভূমি হতে ৫মিঃ উচু। বেস্টনী প্রাচীর ছাড়াও পূর্ব দিকে নদী ও অপর তিনদিকে গভীর পরিখা নগরীর অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন হতে জানা যায় যে, কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এ স্থান পরাক্রমশালী মৌর্য , গুপ্ত এবং পাল শাসক বর্গের প্রাদেশিক রাজধানী ও পরবর্তীকালে হিন্দু সমান্ত রাজাগণের রাজধানী ছিল। দূর্গের বাইরে উত্তর , পশ্চিম , দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিম ৭/৮ কিলোমিটারের মধ্যে এখনও বিভিন্ন ধরনের বহু প্রাচীন নিদের্শন রয়েছে যা উপ-শহরের সাক্ষ্য বহন করে। উল্লেখ্য, বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হুয়েন সাঙ ভারতবর্ষ ভ্রমণকালে (৬৩৯-৬৪৫) পুন্ড্রনগর পরিদর্শন করেন। প্রখ্যাত বৃটিশ প্রত্নতত্ববিদ স্যার আলেকজেন্ডার কানিংহাম ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দে মহাস্থান গড়ের ধ্বংসাবশেষকে ফুয়েন সাঙ বর্ণিত পুন্ডু নগর হিসেবে সঠিক ভাবে সনাক্ত করে।
ভাসু- বিহার:

স্থানীয়ভাবে নরপতির ধাপ নামে পরিচিত এ প্রত্নস্থলে ১৯৭৩-৭৪ সনে উৎখনন শুরু করা হয় এবং পরবর্তী দুই মৌসুম তা অব্যাহত থাকে দুটি মধ্যম আকৃতির সংঘারাম ও একটি মন্দিরের স্থাপতিক কাঠামোসহ প্রচুর পরিমাণ প্রত্নবস্ত্ত উম্মোচিত হয়। অপেক্ষাকৃত ছোট সংঘারামটির আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ৪৯ মিঃ ও পূর্ব পশ্চিমে ৪৬ মিঃ। এর চার বাহুতে ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য ২৬টি কক্ষ এবং কক্ষগুলোর সামনে চর্তুপার্শ্বে ঘোরানো বারান্দা এবং পূর্ববাহুর কেন্দ্রস্থলে প্রবেশ পথ রয়েছে। বৃহদায়তনের বিহারটির ভূমি পরিকল্পনা ও স্থাপত্য কৌশল প্রথমটির অনুরূপ পরিমাপ পূর্ব পশ্চিমে ৫৬মিঃ ×উত্তর দক্ষিণে ৪৯ মিঃ এর চার বাহুতে ৩০টি ভিক্ষু কক্ষ এবং দক্ষিণ বাহুর কেন্দ্রস্থলে প্রবেশ পথ অবস্থিত। বিহারের অদুরে উত্তরমূখী মন্দিরটির আয়তন উত্তর -দক্ষিণে ৩৮মিঃ এবং পূর্ব পশ্চিমে ২৭মিঃ মন্দিরের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে একটি বর্গাকার মন্ডপ। এর চতুর্দিকে ধাপে ধাপে উন্নীত প্রদক্ষিণ পথ। প্রায় ৮০০ প্রত্নবস্ত্তর মধ্যে ব্রোঞ্জের ক্ষুদ্রাকৃতির মূর্তি, পোড়ামাটির ফলক এবং পোড়ামাটির সীল খুবই গুরুত্বপূর্ণ এছাড়াও সংগৃহীত হয়েছে মূল্যবান পাথরের গুটিকা, লোহার পেরেক, মাটির গুটিকা, নকসাঙ্কিত ইট, মাটির প্রদীপ ও অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যবহারের দ্রব্যাদি এবং প্রচুর মৃম্ময় পাথর টুকরা। এ সমস্ত বিভিন্ন ধরনের প্রত্নবস্ত্তর থেকে ভাসু বিহারের শেষ যুগের (দশ/একাদশ শতক) শিল্পকর্ম ও দৈনন্দিন যাত্রার একটি পরিচয় পাওয়া যায়।
করতোয়া নদী:

রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত একটি ছোট নদী যা একসময় একটি বড় ও পবিত্র নদী ছিল। এর একটি গতিপথ বর্তমানে বগুড়া জেলার মহাস্থানগড় দিয়ে (যা পুণ্ড্রনগর নামে পরিচিত ও প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন নগরীর রাজধানী) প্রবাহমান। করতোয়া মাহাত্ম্য এর অতীত ঐতিহ্যের প্রমাণ করে। মহাভারতে বলা আছে যে, তিনদিন উপবাসের পর করতোয়া নদীতে ভ্রমণ করা অশ্বমেধা (ঘোড়া বলিদান) এর সমান পূণ্যের সমান। আরেকটি প্রাচীন শহর শ্রাবস্তী, খুব সম্ভবত মহাস্থানগড়ের উত্তরে করতোয়ার পাড়ে অবস্থিত ছিল। অবশ্য শ্রাবস্তীর সম্ভাব্য অবস্থান নিয়ে বিতর্ক আছে।
বগুড়ার দই

কথা শিল্পী সৈয়দ মুজতবা আলীর 'রসগোল্লা' গল্প থেকে জানা যায় আমাদের রসগোল্লা নিয়ে বিদেশের ইমিগ্রেশনে কি লঙ্কা কান্ডই না ঘটে ছিল। রসগোল্লা মুখে দিয়ে ইমিগ্রেশনের বড় বাবু আড়াই মিনিট নাকি মুখ বন্ধ করে রেখেছিল অভিভূত হয়ে। বঙ্গ দেশের রসগোল্লার মত আমাদের বগুড়ার দই নিয়ে আছে অনেক মজার কান্ড।
পাকিস্তানের তৎকালীন স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বগুড়ায় এসে দইয়ের স্বাদ পেয়ে ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তাদের সহানুভূতি পেতে পাঠান এই দই।
বিদেশে বগুড়ার দইয়ের খ্যাতি সর্বপ্রথম ১৯৩৮ সালে ইংল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে। ওই বছরের গোড়ার দিকে তৎকালীন বাংলার ব্রিটিশ গভর্নর স্যার জন এন্ডারসন বগুড়া নওয়াব বাড়ি বেড়াতে এসে প্রথম দইয়ের স্বাদ গ্রহণ করেন। তাকে কাচের পাত্রে তৈরি করা বিশেষ ধরনের দই খেতে দেওয়া হয়। লোভনীয় স্বাদের কারণে গভর্নর এন্ডারসন বগুড়ার দই ইংল্যান্ডে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন।
বগুড়ার দই এর স্বাদ পেতে এখন ভারত উঠে পড়ে লেগেছে। গত বছর জলপাইগুড়ি জেলার চেম্বার কর্মকর্তাদের মধ্যে বগুড়ার দই নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। ওই সময়ে সেখানে অনুষ্ঠিত বাণিজ্যমেলায় বগুড়ার দইয়ের কদর এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে বগুড়া থেকে ১০ মেট্রিক টন (প্রতিটি ৬শ' গ্রাম ওজনের ১৭ হাজারেরও বেশি সরা) দই সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। পরে অবশ্য অল্প সময়ের মধ্যে এত দই পাঠানো যায়নি। গত বছর ডিসেম্বরে জলপাইগুড়িতে অনুষ্ঠিত নর্থ বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এনবিএনসিসিআই) আয়োজিত বাণিজ্যমেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ৫শ' কেজি দই পাঠানো হয় বগুড়া থেকে। আর যায় কোথায়! দইয়ের স্বাদ পেয়ে সেখানকার লোক পিপড়ের মতো লাইন ধরে। ভিড় করতে থাকে স্টলে। এত চাহিদা পূরণ করা যায়নি।
বাংলাদেশের অন্যান্য জেলা কিংবা অঞ্চলে উৎপাদিত হলেও কিছু বিশেষত্বের কারণে 'বগুড়ার দই'-এর খ্যাতি দেশজুড়ে। উৎপাদন ব্যবস্থার প্রতিটি পর্যায়ে কারিগরদের (উৎপাদক) বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণের পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তারা যত্নবান হওয়ায় বগুড়ার দই স্বাদে-গুণে তুলনাহীন। প্রায় দেড়শ' বছর আগে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ঘোষ পরিবারের হাত ধরে বগুড়ায় দইয়ের উৎপাদন শুরু। পরবর্তী সময়ে বগুড়ার নওয়াব আলতাফ আলী চৌধুরীর (পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর বাবা) পৃষ্ঠপোষকতায় শেরপুরের ঘোষ পরিবারের অন্যতম সদস্য গৌর গোপাল বগুড়া শহরে দই উৎপাদন শুরু করেন।
বগুড়ার দই ব্রিটেনের রানী ভিক্টোরিয়া রানী এলিজাবেথ থেকে শুরু করে মার্কিন মুল্লুকে পৌঁছে গেলেও আমরা এই দই বড় পরিসরে রপ্তানী করতে পারছি না। রফতানির সম্ভাবনা থাকলেও কাস্টমসের ট্যারিফ সিডিউলে পণ্যের তালিকায় দইয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের বাইরে বাজার সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে না।
আশা করছি সরকার এই বিষয়ে আন্তরিক হবে। আমাদের দেশীয় খাবারের এত সুনাম তারপরও কেন আমরা এ থেকে মুনাফা অর্জন করতে পারছি না তা এক বড় দুঃখ।
খেড়ুয়া মসজিদ, শেরপুর:
এটি সুলতানী ও মোগল আমলে নির্মিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ।
খেরুয়া মসজিদ বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন। মোগল-পূর্ব সুলতানি আমলের স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে মোগল স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে নির্মিত এই মসজিদ। প্রায় ৪৩০ বছর ধরে টিকে থাকা এই মসজিদের অবস্থান বগুড়া শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে শেরপুর উপজেলা সদরের খোন্দকার টোলা মহল্লায়।মসজিদটি টিকে আছে চার কোণের প্রকাণ্ড আকারের মিনার আর চওড়া দেয়ালের কারণে। ইটে খোদাই করা নকশা ক্ষয়ে গেছে এবং চুন-সুরকির প্রলেপ ঝরে গেছে। চুন-সুরকি দিয়ে গাঁথা পাতলা লাল ইটের দেয়ালগুলো ১.৮১ মিটার চওড়া। তার ওপর ভর করেই ছাদের ওপর টিকে আছে খেরুয়া মসজিদের তিনটি গম্বুজ। খেরুয়া মসজিদ বাইরের দিক থেকে উত্তর-দক্ষিণে লম্বা ১৭.২৭ মিটার, প্রস্থ ৭.৪২ মিটার। পূর্ব দেয়ালে তিনটি খিলান দরজা। মাঝেরটি আকারে বড়। উত্তর-দক্ষিণে একটি করে খিলান দরজা। কোনোটিতেই চৌকাঠ নেই। ফলে দরজার পাল্লা ছিল না। পূর্বের বড় দরজাটির নিচে কালো পাথরের পাটাতন। পূর্বের দরজা বরাবর পশ্চিমের দেয়ালের ভেতরের অংশে তিনটি মেহরাব। মেহরাবগুলোর ওপরের অংশ চমৎকার কারুকাজখচিত। মসজিদটির নিচের অংশে ভূমি পরিকল্পনা মোগল স্থাপত্যরীতির। ওপরের অংশ মোগল-পূর্ব সুলতানিরীতিতে। চার কোণে দেয়াল থেকে খানিকটা সামনে চারটি বিশাল মিনার। ছাদের ওপর তিনটি ৩.৭১ মিটার ব্যাসের অর্ধ গোলাকৃতির গম্বুজ। কার্নিশ ধনুকের মতো বাঁকা। তার তলায় সারিবদ্ধ খিলান আকৃতির প্যানেলের অলংকরণ। অত্যন্ত সুন্দর এর দেয়ালের গাঁথুনি। নান্দনিক বৈচিত্র্য আনা হয়েছে ইটের বিন্যাস ও খাড়া প্যানেল তৈরি করে। সামনের অংশের ইটে আছে ফুল-লতা-পাতা খোদাই করা নকশা। মিনার, গম্বুজ, নকশা ও ইটের বৈচিত্র্যময় গাঁথুনিতে পুরো স্থাপত্যটি অত্যন্ত নান্দনিক হয়ে উঠেছে। মসজিদের সামনে সবুজ ঘাসে ঢাকা আয়তাকার মাঠ। মসজিদের কিনার দিয়ে তাল, নারকেল, আম, কদমগাছের সারি। এক পাশে মৌসুমি ফুলের গাছও আছে। ইটের প্রাচীরের ওপর লোহার রেলিং দিয়ে পুরো চত্বর ঘেরা। মোট জায়গার পরিমাণ প্রায় ৫৯ শতাংশ। নামাজের সময় মুসল্লিরা ছাড়া সাধারণত কেউ ভেতরে প্রবেশ করে না। তাই প্রাঙ্গণটি নিরিবিলি এবং খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। গাছগাছালিঘেরা সবুজ পরিবেশে তিন গম্বুজওয়ালা প্রাচীন স্থাপত্যটিকে মনোরম দেখায়।